বৃহস্পতিবার, ৭ মার্চ, ২০১৩

সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়াতে গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বান

সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়াতে গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বান

1 / 1
সারা দেশে জামায়াত-শিবিরের সাম্প্রদায়িক তাণ্ডবের শিকার হিন্দুসহ অমুসলিম জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা এসেছে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গণজাগরণ সমাবেশ থেকে।


 
চার দশক আগে এই দিনে তখনকার এই রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের ডাক দিয়েছিলেন।
৪২ বছর পরে এই ময়দান থেকেই যারা মুক্তির সংগ্রামের বিরোধিতা করে হত্যা-ধর্ষণ-লুটপাট করেছিল, তাদের বিচারের দাবি ঘোষিত হল নতুন প্রজন্মের বজ্রকণ্ঠে।
যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে গড়ে উঠা গণজাগরণ মঞ্চের শাহবাগের বাইরে বৃহস্পতিবার ছিল ষষ্ঠ সমাবেশ।
সমাবেশে গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার বলেন, বিগত দিনে হরতালের নামে জামায়াত-শিবির সারা দেশে যে সাম্প্রদায়িক তাণ্ডব ছড়িয়েছে, তার বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। গণজাগরণ মঞ্চও ভিন্নধর্মালম্বীদের পাশে দাঁড়াবে।
সাম্প্রদায়িক নির্যাতনের শিকার মানুষদের পাশে সবাইকে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “গণজাগরণ মঞ্চের পক্ষ থেকেও আমরা তাদের পাশে দাঁড়াব।

“প্রতিটি পাড়া মহল্লায় এই অপশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলুন। এই বাংলায় হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খৃস্টান সবার এক পরিচয়, তারা এই দেশের নাগরিক।”তবে আন্দোলনের অহিংস ধারা অব্যাহত রাখার জন্য তিনি সবার উদ্দেশে বলেন, “কোনো নৈরাজ্য যেন সৃষ্টি না হয় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। যে কোনো ধরনের অপপ্রচার, প্ররোচনা, উস্কানি বা মিথ্যাচারে বিভ্রান্ত হবেন না।
“এমন কিছুই আমরা করব না, যা রাষ্ট্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, জনগণের জানমালের ক্ষতিসাধন করে,” দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেন ইমরান।
যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি ও জামায়াত নিষিদ্ধের দাবি বাস্তবায়নে প্রত্যয়ী ইমরান বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে হৃদয়ে লালন করে, সাতই মার্চের অগ্নিশিখা জ্বালিয়ে অহিংস আন্দোলনের মধ্য দিয়েই আমরা বিজয়ী হয়ে ঘরে ফিরব।”
সাতই মার্চকে এ আন্দোলনের দিক নির্দেশক হিসাবে আখ্যায়িত করে ইমরান বলেন, মুক্তিযুদ্ধোত্তর সময় থেকেই বাঙালি জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাপ্রসূত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার।
“কিন্তু স্বাধীনতার বিয়াল্লিশ বছর পরে আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, সাতক্ষীরা, খুলনা বগুড়াসহ সারাদেশে আমার ভাইয়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত।”
“সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির যে অনাবিল ঐশ্বর্য বাঙালি তার হৃদয়ে ধারণ করে এসেছে, জামাত-শিবিরের সন্ত্রাসীরা আজ তা বিনষ্টের জন্য হিংস্র ছোবল তুলেছে।”
যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি ও আইন করে জামায়াত শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা দাবি পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, “যুদ্ধাপরাধীমুক্ত ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার জন্য আজ আমরা ঐক্যবদ্ধ।”
গণস্বাক্ষর কর্মসূচির সময় বাড়লো
বৃহস্পতিবারই গণস্বাক্ষর কর্মসূচির শেষ দিন হলেও গত কয়েকদিনের পরিস্থিতির কারণে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কথা চিন্তা করে আগামী ২২ মার্চ পর‌্যন্ত তা বাড়ানো হয়েছে।
এই কর্মসূচিতে অংশ নেয়ার জন্য সবার প্রতি আনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, “আপনার একটি স্বাক্ষর এই দাবি আদায়ের জন্য একটি সাহসী প্রতিনিধি।”
এছাড়া শুক্রবার বিকাল তিনটায় নারী জাগরণ সমাবেশে অংশ নেয়ার জন্য পেশাজীবী ও শ্রমজীবী নারী সংগঠনগুলোসহ সব নারীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
এজন্য সব গার্মেন্টস মালিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ইমরান বলেন, “আপনারা কাল বিকাল তিনটায় কারখানা ছুটি দিয়ে সব নারী শ্রমিকদের সমাবেশে পাঠিয়ে দেবেন।”
একইসঙ্গে বিভাগীয় শহরগুলোতে পরবর্তী সমাবেশ অনুষ্ঠানের জন্য সেখানকার আয়োজকদের প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে ইমরান বলেন, আগামীকালের নারী জাগরণ সমাবেশ থেকে বিভাগীয় শহরগুলোতে সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
বক্তব্য শেষে যুদ্ধাপরাধীদের সব আর্থিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং তাদের সব গণমাধ্যম বর্জনের শপথ নেয়া হয়।
বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টায় সব ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ ও জাতীয় সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে সমাবশে শুরু হয়।
এরপর মঞ্চে বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণ অনুকরণ করে শিশু তাজনিম তাজওয়ার অপূর্ব।
এরপর মঞ্চে বক্তব্য দিনে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতারা। সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে- বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন, জাসদ-ছাত্রলীগ, বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী, বাংলাদেশ ছাত্র আন্দোলন, বিপ্লবী ছাত্র সংহতি ও ছাত্র ঐক্য ফোরাম।

সমাবেশে একাত্তরের বীরাঙ্গনা আনোয়ারা বেগমকে দশ হাজার টাকার অর্থ সাহায্য তুলে দেন মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার।এছাড়াও আগামী শুক্রবারের নারী জাগরন সমাবেশে কর্মজীবি ও পেশাজীবি নারীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে আগে থেকেই ছুটি দেওয়ার জন্য গার্মেন্টস ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে অনুরোধ জানান ইমরান।
এর আগে হরতাল প্রত্যাখ্যান করে দুপুর থেকেই সেখানে আসতে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার হাজারো মানুষ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের শিখা চিরন্তন বেদীর পিছন দিকে করা অস্থায়ী মঞ্চকে সামনে রেখে সারিবদ্ধভাবে বসে থাকেন অনেকে। এছাড়া গোটা উদ্যানের বিভিন্ন স্থানে দাঁড়িয়ে বা বসে সমাবেশে অংশ নেন হাজারো জনতা।
যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় প্রত্যাখ্যান করে তার ফাঁসির দাবিতে গত ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই গণআন্দোলনে শরিক হয়েছেন রিকশাচালক থেকে মন্ত্রী, স্কুল শিক্ষার্থী থেকে মুক্তিযোদ্ধারা।
যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির দাবিতে এই আন্দোলন শুরু হয়। পরে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী দল জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধের দাবি তোলে তারা।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন