বৃহস্পতিবার, ৭ মার্চ, ২০১৩

বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ

বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ
প্রধান সম্পাদক: জিয়া উদ্দিন আহমেদ
বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি
প্রচ্ছদ: ইনাম আল হক \ প্রতি খণ্ডের মূল্য: ৫০০ টাকা
বাংলায় ২৮ খণ্ড এবং ইংরেজিতে ২৮ খণ্ড

শেলফে সাজানো ২৮ খণ্ডের ঝলমলে বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ গ্রন্থমালার দিকে তাকালে মনে পড়ে সালার খান স্যারের কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের ট্যাক্সোনমি পড়াতেন।
সর্বদা তাঁর সঙ্গে থাকত ডেভিড প্রেইন প্রণীত দুই খণ্ডের গ্রন্থ বেঙ্গল প্লান্টস—জরাজীর্ণ, ছেঁড়াখোঁড়া ও আমাদের ছুঁতে মানা। মাদ্রাজি এই অধ্যাপক বলতেন, তাঁকে বাংলার গাছপালা চিনিয়েছেন ডেভিড প্রেইন আর কার্জন হলের বোটানিক গার্ডেনের বুড়ো মালিরা।
পরিভাষায় আকীর্ণ ট্যাক্সোনমি, কঠিন উচ্চারণের লাতিন নাম কারও ভালো লাগার কথা নয়। আর শেষ বর্ষে (১৯৫৮) থিসিস হিসেবে সেটাই জুটল আমার ও সহপাঠী সুহূদ নেহাল হোসেন আওরঙ্গজেবের ভাগ্যে। অতঃপর গাছপালার খোঁজে ঘুরে বেড়াতাম গোটা শহর, কখনো টঙ্গী ও জিঞ্জিরা-শুভাঢ্যা। মতিঝিলের বিরান জঙ্গলেও মিলত দুষপ্রাপ্য উদ্ভিদের নমুনা। প্রেম ও অপ্রেম নাকি একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ, তাই আটকা পড়ে গেলাম বিদঘুটে ট্যাক্সোনমির ফাঁদে। পরীক্ষা শেষে নেহাল গেলেন ঢাকার তুলা গবেষণাকেন্দ্রে, আমি বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে।
ট্যাক্সোনমি পড়াতাম, হার্বেরিয়াম ও মিউজিয়ামের জন্য গাছপালার নমুনা সংগ্রহ করতাম, হাতেকলমে শিক্ষার জন্য ছাত্রদের নিয়ে যেতামশহর লাগোয়া বনবাদাড়ে। একবার গেলাম মৌলভীবাজার, আমাদের বাড়ির কাছের পাথারিয়া পাহাড়ে। কৈশোরের স্মৃতিময় এই পাহাড় স্বপ্ন দেখাল ‘ফ্লোরা’ লেখার। বাদ সাধল বইপত্রের অভাব। হুকারের সাত খণ্ডের দ্য ফ্লোরা অব ব্রিটিশ ইন্ডিয়া, কাঞ্জি লালের চার খণ্ডের আসাম ফ্লোরা দূরে থাক, ডেভিড প্রেইনের বইটিও তখন দুষপ্রাপ্য। অগত্যা চিঠি লিখলাম সাহায্যের জন্য ‘বোটানিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া’ অফিসে। ফল হলো বিষময়। ওদের উত্তরটা কীভাবে যেন পৌঁছে গেল ঢাকার সচিবালয়ে, শিক্ষা দপ্তরে, তলব এল কৈফিয়তের। আমার অন্যায় হয়ে গেছে ভারতের সরকারি সংস্থা সরাসরি চিঠি লেখায়। সামাল দেওয়া গেল অধ্যক্ষ কবীর চৌধুরীর মধ্যস্থতায়। ইতি ঘটল ‘ফ্লোরা’ লেখার।
এশিয়াটিক সোসাইটির জীবজ্ঞানকোষ প্রকল্পে কাজ করার সময় এসব কথা মনে পড়ত এবং এই ভেবে
ভারি আনন্দ হতো যে বাংলাদেশের উদ্ভিদকুল-প্রাণীকুল নিয়ে কাজ করতে আর কাউকেই এমন কদর্য বিড়ম্বনা পোহাতে হবে না। ২৮ খণ্ডের ইংরেজি (এনসাইক্লোপিডিয়া অব ফ্লোরা অ্যান্ড ফউনা অব বাংলাদেশ) ও ২৮ খণ্ডের বাংলা (বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ) মোট ৫৬ খণ্ডের গ্রন্থ। এই গ্রন্থমালাকে বলা যায় আমাদের জীব-ইতিহাসের ভিতস্তম্ভ, জাতির জন্য এক অত্যুত্তম উপহার।
সৎ কর্ম নির্বিঘ্নে নিষ্পন্ন হওয়ার দৃষ্টান্ত বিরল। এখানেও ব্যতিক্রম হয়নি। শুরু থেকে প্রকাশনা (২০০৫-২০১১) পর্যন্ত জীবজ্ঞানকোষের মতো একটি শুদ্ধ একাডেমিক কর্মেও বারবার অবাঞ্ছিত সরকারি হস্তক্ষেপ ঘটেছে, কর্মপরিষদের ও গবেষকদের কেউ কেউ কর্মচ্যুত হয়েছেন, অনুদান বন্ধ হয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত সোসাইটির নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি শেষ হতে পেরেছে। পরিব্যাপ্ত অনিশ্চয়তার অকুস্থলে এমনটি দৈবাৎ ঘটে।
পাথারিয়া পাহাড় এখন বৃক্ষশূন্য। হারিয়ে গেছে উদ্ভিদকুলের বহু প্রজাতি, জীব-ইতিহাসের অনেক অমূল্য সম্পদ। আশার কথা, বিলম্বে হলেও ‘ফ্লোরা’ লেখার কাজ আবার শুরু হয়েছে, প্রকাশিত হচ্ছে বিভিন্ন অঞ্চলের গাছগাছালি ও জীবজন্তুর ধারাবর্ণনা। প্রাধান্য পাচ্ছে পাহাড়ি এলাকা, পাথারিয়া পাহাড়ও আর দূরে নয়। নতুন প্রজন্মের জীববিদেরা কেবল শুদ্ধ জ্ঞানচর্চা নয়, অনুপ্রাণিত হচ্ছেন পরিবেশদূষণে পর্যুদস্ত প্রজাপতিগুলোর আর্তিতেও। আর এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ হয়ে উঠছে প্রথম ও প্রধান আকরগ্রন্থ।
বলা প্রয়োজন, এই গ্রন্থমালা শুধু বিজ্ঞানী, নিসর্গী, বিদ্যার্থীর জন্য নয়, সর্বসাধারণের জন্যও।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন